মানব ক্লোনিং ( Human Cloning )

মানব ক্লোনিং বলতে বুঝায় একটি মানুষের হুবুহু জ়েনেটিক প্রতিকৃতি তৈরী করা।কৃত্তিম উপায়ে মানুষ তৈরী বুঝাতে ক্লোনিং শব্দটি ব্যবহৃত হয়।ক্লোনিং শব্দটি এসেছে একটি গ্রীক শব্দ “trunk branch” থেকে যার অর্থ গাছের একটি শাখা থেকে আরেকটি শাখা তৈরী করা।
মানব ক্লোনিং সাধারনত দুই প্রকারের-
• থেরাপিউটিক ক্লোনিং (therapeutic cloning)
• রিপ্রোডাকটিভ ক্লোনিং (reproductive cloning)
থেরাপিউটিক ক্লোনিং বলতে বুঝায় একজন পুর্নবয়স্ক মানুষের কোষ থেকে অনুরুপ কোষ তৈরী এবং তা ঔষধশিল্প এবং গবেষনার কাজে ব্যবহার করা।অন্যদিকে রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং বলতে কৃত্তিম মানুষ তৈরী করা বুঝায়, যা এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি এবং বিভিন্ন দেশে এর প্রাকটিস নিষিদ্ধ। এছাড়াও আরো এক প্রকারের ক্লোনিং সম্পর্কে জানা যায়, যার নাম রিপ্লেসমেন্ট ক্লোনিং, এর মাধ্যমে একটি রোগাক্রান্ত বা নষ্ট অঙ্গকে ক্লোনিং প্রকৃয়ায় তৈরী অন্য একটি অঙ্গ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।
কিন্ত ২০০২ সালের ২৭ ডিসেম্বর রেলিয়ান নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ডঃ ব্রিজিত বোইসেলিয়ার পৃথিবীর প্রথম ক্লোন মানব শিশু জন্মের ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড থেকে এ ঘোষণা দেয়া হলেও কোথায় ক্লোন শিশুর জন্ম হয়েছে তা বলা হয়নি। যতদূর জানা যায় ক্লোন শিশুটির জন্ম হয়েছে আমেরিকার বাইরে তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে, যেখানে ক্লোনিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। পৃথিবীর প্রথম ক্লোন মানবকন্যার নাম রাখা হয়েছে ইভ। ৭ পাউণ্ড ওজনের এই কন্যাশিশুটি ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর সিজারিয়ান সেকশন অপরেশনের মাধ্যমে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়। শিশুটির মা একজন আমেরিকান, বয়স ৩১।
১৯৯৬ সালে রোজলিন ইনস্টিটিউট, স্কটল্যান্ডের গবেষক, ডঃ আয়ান উইলমুট, তার ২৭৩ তম চেষ্টায় একটি ভেড়ার একটি দেহকোষের (স্তনবৃন্ত বা বাঁট থেকে সংগৃহীত) কেন্দ্রকে অন্যধরনের ভেড়ার কেন্দ্রবিযুক্ত ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপিত করেন ও তা হতে প্রথম ধরনের সম্পূ্র্ণ ভেড়া ডলিকে তৈরি করে জীব ক্লোনিং এর সফল সুচনা করেন। এর মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিরাট বিপ্লবের সূচনা হবে বলে অনেকে আশা করছে। যদিও মানব ক্লোনিং অধিকাংশ দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১২ ই ডিসেম্বর ২০০১ সালে জাতিসংঘ প্রথম রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং এর বিরুদ্ধে আইন পাশে করে।২০০৬ সালের ডিসেম্বর এ অস্ট্রেলিয়ায় মানব ক্লোনিং নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়,যদিও দেশটিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে থেরাপিউটিক ক্লোনিং কে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮, ২০০১, ২০০৪, এবং ২০০৭ সালে united states house of representative রা ভোট দিয়ে তাদের দেশে সকল প্রকার ক্লোনিং কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন।
ক্লোনিং কিভাবে করা হয়ঃ
রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং প্রকৃয়ায় তৈরীকৃত প্রানীর DNA হুবুহু তার মাতৃ প্রানীর DNA’র মতই হবে। আর এর জন্য ডিম্বানুর DNA বহনকারি নিউক্লিয়াসকে অন্য একটি প্রানীর DNA দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে।তারপর এই ডিম্বানুটিকে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে একটি পরিপুর্ন দেহকোষে পরিণত হওয়ার জন্য গবেষনাগারে রেখে দেয়া হয়, অথবা এটিকে কোন নারীর জরায়ুতেও প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
থেরাপিউটিক ক্লোনিং সাধারনত বিভিন্ন স্টেম সেল তৈরী করতে ব্যবহৃত হয়।এই স্টেম সেলগুলো পরবর্তিতে শরীরের যে কোন কোষের মধ্যেই বৃদ্ধি্লাভ করতে পারে।বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই স্টেম সেল দিয়ে বিভিন্ন ধরণের রোগ যেমন হার্ট ডীজিজ, আলঝেইমার ডিজিজ কে চিকিতসা করা সম্ভব।
ক্লোনিং এর নৈতিক দিক :
মানব ক্লোনিং নৈতিকভাবে ঠিক কি না, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ভেড়ার ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে ডলির জন্মের পর থেকে তা আরও বেড়েছে। তবে মার্কিন চিকিৎসক পানাইওটিস জাভোস বলছেন, কয়েক বছরের মধ্যেই এ বিতর্কের অবসান হবে। জন্ন নেবে বিশ্বের প্রথম ক্লোন শিশু। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। জাভোস দাবি করেছেন, তিনি ১৪টি মানব ভ্রূণ ক্লোন করেছেন। এর মধ্যে ১১টি ভ্রূণ চারজন নারীর গর্ভাশয়ে প্রতিস্থাপন হয়েছে। তবে এঁদের কেউই গর্ভবতী হননি। এঁদের একজন ছিলেন ব্রিটেনের। ক্লোন শিশু জন্নদানের বিষয়ে তাঁরা বেশ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষাটি আপাত সফল হয়নি। জাভোস জোর দিয়ে বলেন, ত্বকের কোষ থেকে ক্লোন শিশু তৈরির ক্ষেত্রে এটি ছিল প্রথম অধ্যায়। এ ছাড়া ওই চার নারী কেন গর্ভবতী হননি, তাও আমাদের জানা। তাই বলা যায়, আমাদের চেষ্টাকে আরও জোরদার করতে পারলে কয়েক বছরের মধ্যেই প্রথমবারের মতো ক্লোন শিশু জন্ন নেবে।
সাইপ্রাস বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক জাভোস মধ্যপ্রাচ্যে গোপন কোনো স্থানে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে মানব ক্লোন নিয়ে গবেষণা নিষিদ্ধ। তবে তিনি ইতিমধ্যে তিনজন মৃত মানুষের ভ্রূণের ক্লোনও করেছেন। এদের মধ্যে ১০ বছরের একটি শিশু ছিল। কাডি নামের এ শিশুটি যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল। শিশুটির রক্তের কোষ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে জাভোসের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
বন্ধ্যত্ব দুরীকরণের চিকিৎসায় নিয়োজিত মূলধারার বিশেষজ্ঞরা জাভোসের এসব দাবি মানতে নারাজ। ক্লোনের কৌশলটি নিরাপদ কি না, তা নিয়ে এসব বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের লর্ড উইনসটন বলেন, ‘জাভোসের দাবির বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি।’ তবে জাভোস জানান, মানব ক্লোনবিরোধী নীতির কারণে কয়েকটি বিজ্ঞান সাময়িকী তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ ছাপতে রাজি হয়নি।
প্রথম যখন ক্লোনিং করে ভেড়া শিশুর জন্ম দেয়া হয় , তখন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরাই এ তথ্য প্রকাশ করেছিলেন যে, এর আগে তাদের ব্যর্থতার সংখ্যা ছিল ২৭৬। ২৭৬ বার যদি ভেড়া শিশুর জন্ম প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়ে থাকে তাহলে মানব শিশুর ক্লোনিংয়ের ব্যর্থতারও তো একটি সংখ্যা থাকবে । তো , জন্মের পথে কিংবা জন্মের পর পূর্ণাঙ্গতার ক্ষেত্রে যতগুলো ব্যর্থতা কিংবা ভুল হবে এসব মানব প্রাণের দায় কে নেবে?
সর্বোপরি প্রশ্ন দেখা দেবে এ নতুন মানব সন্তানের পিতৃ,মাতৃ, বংশ ও ঐতিহ্য পরিচয় নিয়ে। বলা কঠিন হবে যে, এ ব্যক্তিটি কে? তার ব্যক্তিত্বের সংকট বা পার্সনালিটি ক্রাইসিস কীভাবে মোকাবেলা করা হবে?
এরপর আসবে একটি অমানবিক নিষ্ঠুরতা যে, একটি ক্লোন মানবের জন্মদিবসেই হবে তার মুল উৎস ব্যক্তিটির সমান বয়স। শৈশব, কৈশোর ও ক্রমবিকাশের মধুর মানবিকতা থেকে সে হবে বঞ্চিত। কী কঠিন সমস্যা!
মানব ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রে যেমন যুক্তি রয়েছে তেমনি সভ্য পৃথিবীতে এর নৈতিক ভিত্তির বিপক্ষেও কিছু যুক্তি বিবেচনায় আসার দাবী রাখে। জীন তত্ত্বের বিজ্ঞানী William Muir I Dr. Harry Griffin ও ভ্রূণতত্ত্ববিদ Richard Gardner এর মতে-
(1) জিনে Mutation ঘটে বিকৃত মস্তিষেকর মানুষ তৈরী হতে পারে।
(2) ক্লোন শিশু ধারণকারী মায়ের গর্ভাশয়ে Chorio-carinoma ধরনের ক্যানসার রোগ হতে পারে, যা পরে গর্ভফুলে (Placenta ) ছড়িয়ে যেতে পারে।
(3) ক্লোন করা মানুষটি তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যেতে পারে।
(4) নির্ধারিত সময়ের আগে গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে।
(5) প্রযুক্তিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে, যা গরীব দেশের পক্ষে করা সম্ভব হবে না।
(6)সামাজিক, পেশাগত, রাজনৈতিক পরিচয়, পিতৃত্ব, পুত্রত্ব বা আত্মীয়তার সকল বন্ধনের মূল ব্যক্তিটি এবং তার কোষসঞ্জাত নতুন মানুষটি বা মানুষগুলোর সহাবস্থান কেমন হবে? কোন নৈতিকতার ভিত্তিতে হবে?
এছাড়া ক্লোন শিশুদের যদি মানবশিশু হিসাবে মূল্যায়ন না করা হয় তাহলেও কিছু নৈতিকতার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ওরা মানবশিশু কিনা? এ প্রশ্ন তোলা একদিকে যুক্তিসঙ্গত আর অন্যদিকে যুক্তিহীনও মনে হতে পারে। কেউ কি ক্লোন শিশুদের মেরে ফেলার বা ধ্বংস করার বিধান দেবেন? এসব কথা চিন্তা করেই সম্ভবত আগে থেকেই মানব ক্লোনকে নিষিদ্ধ করার দাবী উঠেছিল উন্নত বিশ্বে। একদিকে বিজ্ঞানীরা বলছিলেন বিজ্ঞানের উন্নতির কথা, অন্যদিকে সমাজ বিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মগুরুরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিপর্যস্ত হওয়ার ভয় দেখাচ্ছিলেন। একে অবশ্য শুধু মনের ভয় হিসেবে দেখা যাবে না। রেলিয়ানরা যতই প্রবোধ দিক না কেন কেউ তো জানে না ক্লোন করার সময় নৈতিকতা ও মানবীয়
image

স্বাভাবিকত্বকে মানা হচ্ছে কিনা।

Advertisements

Leave a Reply/আপনার মতামত জানান

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.