বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির সহজ উপায়

আচ্ছা, দিনে কতবার আপনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘ আমি পারছি না’ , ‘ আমাকে দিয়ে আসলে কিছু হবে না!’ ? আপনার শতভাগ উজাড় করে দেয়ার পরও কি কিছুই হচ্ছে না? চাকরির ইন্টারভিউটা কি খুব খারাপ হয়ে গেলো? সারারাত জেগে একটা প্রেজেন্টেশন বানালেন, অথচ মন্তব্য পেলেন যে খুবই বাজে হয়েছে! কিন্তু, এমন হলে তো সেটা নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই। আপনার হয়তো ধারণাই নেই যে কত মানুষ এরকমপরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন যাচ্ছে! কেউ কেউ লাগাম ধরেই রাখে, আর একটা কিছু করে উতরে যায়। আর কেউ কেউ আশা হারিয়ে হাল ছেড়ে দেয়। বিষণ্ণতার কারণে ক্ষুধা আর ঘুম তো চলে যায়ই, সর্বোপরি স্বাস্থ্যের ওপরই ক্ষতিকর প্রভাবটা পড়ে। বিষণ্ণতা যে কেবল আপনার জীবনকে উপভোগ করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় তা নয়, বরং আপনাকে আত্মহত্যাপ্রবণও করে তুলতে পারে। বিষণ্ণতা থেকে কিভাবে নিজেকে বের করে আনতে পারেন তার কিছু উপায় এখানে জেনে নিতে পারেন।
ঘরের বাইরে বের হন নিজের জন্য একটা ছোট্ট সাহায্য – সেটা হলো যে নিজেকে অন্ধকার ঘরটা থেকে বের করে আনুন। আপনার জন্য বাইরে কি অপেক্ষা করছে তা কি আপনি জানেন? আর কিছু না হোক, রাস্তার ধারের দোকানটায় দাঁড়িয়ে একটা খাবার কিনেই খান না! শপিং করতে যান, কিংবা এমনি এমনি শপিং মল-এ ঘুরুন। একটু ভিন্ন মেকআপ বা পারফিউম লাগিয়ে দেখতে পারেন কেমন লাগে নিজেকে! নতুন জামা, ব্যাগ, এমনকি জুতোটাও পাল্টে দেখুন না! জীবনে যে জিনিসগুলো নিয়ে আপনি প্রচণ্ড কৃতজ্ঞ, সেগুলো নিয়ে একটা জার্নাল লিখতে শুরু করতে পারেন। দেখবেন, আপনা আপনিই আপনার মন ভালো হয়ে যাবে এটা ভেবে যে আশেপাশের আর অনেকের চাইতে আপনি কত ভাগ্যবান! অনেকদিন নিজের যত্ন নেয়া হয় না? একটু পেডিকিওর, মেনিকিওর কিংবা হট অয়েল মাসাজ চলতেই পারে! নিজেকে দেখতে সুন্দর লাগলে মনও ভালো লাগে। আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা নিয়ে চিন্তাও কিন্তু আপনাকে বিষণ্ণ করে তুলতে পারে, আর এমন হলে সেটা ঠিক করতে হবে আপনার নিজেকেই। একদিনে ১০,০০০ কদম হাঁটবেন। এরকম একটা চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন নিজের সাথেই। নিজেকে উদ্যত করুন এই বলে যে ‘আজ ১০০০০ কদম হাঁটবোই’ । যেটুকু রাস্তা হেঁটে যাওয়া যায়, সেটুকুর জন্য রিকশা বা গাড়ি বর্জন করুন। আবার ভাবুন যে আপনার কাউচটা বড় না ৫০০০ টাকা বড় ? সুতরাং, ৫০০০ টাকা পেতে হলে তো সোফায় বসে থাকলে চলবে না, দৌড়ান! এসব সিদ্ধান্ত কিন্তু এক সেকেন্ডেরও ব্যাপার না! কিন্তু দেখবেন, যখনই আপনি প্রথম পদক্ষেপটা নিয়ে নিয়েছেন, আপনার আপনা থেকেই অনেক ভালো লাগতে শুরু করবে।
মনের কথাটা খুলে বলুন মনের মধ্যে কথাগুলো চেপে না রেখে বরং বলে ফেলে হাফ ছাড়ুন! মনের ভেতর কথাগুলো যদি বদ্ধ করে রাখেন, তাহলে তো মন আরও ভার লাগবে। কারো সাথে মন খুলে কথা বলুন, সে হতে পারে আপনার বন্ধু, হতে পারে আপনার আরও ঘনিষ্ঠ কেউ। বিশ্বাস করুন, এতে আপনার অনেক হাল্কা বোধ হবে। মনে হবে যেন ঘাড় থেকে একটা বোঝা নামলো। বিষণ্ণতা লুকানোর কিছু নেই । অনেকেই তাদের বিষণ্ণতা গোপন করে চলে আর সবার সামনে ভাব করে যে সে বেশ ভালো আছে। এটা কিন্তু আরও গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং, বিষণ্ণতার কথা কাউকে না কাউকে খুলে বলুন, কিংবা নিজেই পড়াশোনা করুন কি করা যাতে পারে বিষণ্ণতা কাটাতে। কিংবা, কোনো ডাক্তারের সাথেও কথা বলতে পারেন সঠিক নির্দেশনা পাবার জন্য।
উৎসাহ জাগাতে বই কিংবা মুভি একটা ডিভিডি’র দোকানে গিয়ে কিনে নিতে পারেন পছন্দের মুভিগুলো, কিংবা সেসব মুভি যেগুলো আপনি অনেকদিন ধরেই দেখবেন বলে ভেবেছেন, কিন্তু দেখা হয়নি। আমি বলবো যে মুভি কিনতে যাবার আগে ইন্টারনেটে একটু নিজের মতো গবেষণা করে নিতে পারেন যে কোন কোন মুভি কিনবেন। এমন মুভি কিনুন যেগুলো এই মুহুর্তে আপনার মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগাবে। একটা ভালো মুভি দেখলে অনেকসময়ই মন খুব ভালো হয়ে যায়। আপনি চাইলে সিনেমা হলে ( যেমন বসুন্ধরা সিটি সিনেপ্লেক্স) গিয়েও মুভি দেখতে পারেন। একটা পানীয়ের গ্লাস হাতে নিয়ে হলে বসে বড় পর্দায় মুভি দেখার মজা অন্যরকম আর আপনারও সেটা মোটেই খারাপ লাগবে না। অনুপ্রেরণা জাগাবে এমন বই-ও পড়তে পারেন। আমার কথা যদি বলি, হুমায়ুন আহমেদ-এর হিমু সিরিজের যে কোনো বই-ই আমার মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট।
একটু ব্যায়াম, একটু হাসি সুস্বাস্থ্য আপনাকে যেমন সতেজ রাখবে, তেমনি হাসি-খুশিও রাখবে। নিয়মিত যোগ ব্যায়াম বা জগিং আপনাকে তরুণ ও নির্মল অনুভব করাবে। আপনি চাইলে সালসাও ( এক ধরণের নাচ) শুরু করতে পারেন! তাতে একই সাথে ব্যায়ামও হবে, বিনোদনও হবে। যদি এগুলোর একটাও আপনার করতে ভালো না লাগে, তাহলে পছন্দের বলিউড মুভির গান ছেড়েই আধা ঘণ্টা নাচুন না! ব্যায়ামের সাথে সাথে আপনার মুখে সুন্দর হাসিটাও থাকা চাই। এতে করে যে কেবল আপনাকে দেখতে ভালো লাগবে তা না, আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কিন্তু বাড়বে! অবাক হচ্ছেন যে হাসির সাথে আবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সম্পর্ক কি? বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, হাসি আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে! মনে রাখবেন, ভ্রুকুটি করার চেয়ে কিন্তু হাসা অনেক সহজ!
বন্ধু , কি খবর বল! বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে ভালো উপায় আর কিছুই হতে পারে না। আপনি যখন বন্ধুদের সাথে থাকেন, তখনই আপনি নিজেকে সবচেয়ে ভালো চিনবেন। বন্ধুরা হচ্ছে রঙ্গিন বেলুনের মতো! যত যাই ঘটুক না কেন, তাদের সঙ্গ আপনাকে আনন্দ দেবেই! বন্ধুদের কল দিয়ে কথা বলুন। তাদেরকে আপনার বাসায় আসতে বলুন, কিংবা আপনিই তাদের বাসায় চলে যান। বন্ধুদের সাথে যতটুকু সময় কাটানো যায় কাটান। অ্যাডভেঞ্চারাস কোনো সফরে যান, সিনেমা দেখুন, একসাথে রাত কাটান, আপনার কল্পনায় যা যা পাগলামি আসে সব করুন! নীলগিরিতে একটা সফর হলে কেমন হয়? আমি বাজি ধরে বলতে পারি আপনি মোটেই অনুতাপ করবেন না!
সেবা করুন অন্যের কারো আশীর্বাদ পাওয়া অবশ্যই আনন্দের, কিন্তু তার চাইতেও আনন্দের কারো জন্য আশীর্বাদ হওয়া। কাউকে সাহায্য করতে পারার অনুভূতি অবশ্যই ভালো লাগার। আপনি আর গ্রাহক থাকেন না, বরং আপনি নিজেই তখন সমাজকে কিছু দেন। এটা যে কেবল আপনার আত্মবিশ্বাসই বাড়াবে তা নয়, বরং আপনাকে এটাও অনুধাবন করতে সাহায্য করবে যে আপনার মধ্যে এমন কিছু আছে যা অন্য অনেকের মাঝেই নেই।
নতুন প্রতিভার সাধনা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করুন। যেকোনো সময়ই আপনি নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে পারেন। গিটার শিখতে পারেন কিংবা আলোকচিত্রের একটা কোর্স করতে পারেন। ছবি আঁকা বা রান্নার ক্লাসও হতে পারে! নিজেকে ব্যস্ত রাখুন যাতে বিষণ্ণতা ভর করার কোনো সুযোগই না পায়। মনে রাখতে হবে যে কেউ যেন আপনাকে এটা বলার সুযোগ না পায় যে ‘ তোমাকে দিয়ে হচ্ছে না!’ এমনকি আপনি নিজেও যেন নিজেকে এটা বলার সুযোগ না পান!

Advertisements

Leave a Reply/আপনার মতামত জানান

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s